মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন

 আবার বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

 আবার বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

সাঈদুর রহমান রিমন : রাজধানীসহ দেশের ৪২ জেলায় দেড় সহস্রাধিক কিশোর গ্যাংয়ের আওতায় প্রায় ৮০ হাজার কিশোর ‘উঠতি অপরাধীতে’ পরিনত হয়েছে। এরমধ্যে শুধু রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় দেড়শ’ গ্যাংয়ের ১০ হাজার দুর্বৃত্ত কিশোরের অবস্থান। গত এক বছরে সারাদেশে প্রায় ছয়শ’ হত্যাকান্ডের সঙ্গেই কিশোর গ্যাং বা গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে পাঠানো মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এ আতঙ্কজনক তথ্য ফুটে উঠেছে। ইদানিং এ কিশোরদের হাতেই নতুন চকচকে ক্ষুদে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক তুলে দেয়ার তথ্যও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিশোর গ্যাং উপদ্রুত প্রতিটি স্থানেই অস্ত্র মাদকের সম্পৃক্ততা রীতিমত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তারা বলছেন, এ বয়সের শিশু কিশোররা পূর্বাপর না ভেবেই যে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্রধারী কিশোরদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধ ধারাবাহিকভাবে সংঘটনেরও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি মর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেছেন, পেশাদার অপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত নয় এমন হাজার হাজার উঠতি সন্ত্রাসী দেশ ও সমাজের জন্য দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, খুব শিগগির পুলিশের সকল ইউনিটকে কিশোর গ্যাং সদস্যদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে সাঁড়াশি অভিযানের নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা অনুবিভাগে পাঠানো দুটি গোয়েন্দা বিভাগের পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে মহল্লা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আড্ডাস্থল কেন্দ্রীক গ্যাংগুলো গড়ে উঠছে। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে কোনরকম সমন্বয় ছাড়াই সারাদেশে একই স্টাইলে গ্যাং গঠন ও বিস্তৃতির বিষয়টি নিয়ে তারা বিস্তর অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে মাদকসেবন ও অপরাধ তৎরতায় জড়িত তরুণরাই গ্রুপগুলোর লিডার পর্যায়ে থাকায় পর্যায়ক্রমে সদস্যরাও অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন তাদের স্কুল কলেজকেও বাইরের ঝুক্কি ঝামেলা, হাঙ্গামা, সংঘাত কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এসব সংঘাতের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করে। কিন্তু কিছুতেই থামছে না গ্যাং কালচার ও কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা। মাদক, রাজনীতি, পারিবারিক বন্ধনহীনতা, সামাজিক শাসনমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোরদের হিরোইজমের নেশায় পেয়ে বসেছে। বিপথগামী কিশোররা এলাকায় মাদক ব্যবসা, সেবন, চাঁদাবাজি এমনকি অবলীলায় হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। কিশোরদের এলাকাভিত্তিক গ্যাংয়ের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরেই ঘটছে সহিংসতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব বিপথগামী কিশোরদের আটকের পর আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে স্বজনদের কাছে তুলে দিয়েও বিন্দুমাত্র সুফল পাচ্ছে না।

বরং তাদের ঔদ্ধত্যতা, উন্মত্ততা যেমন বেড়েছে তেমনি তারা যুক্ত হচ্ছে মারাত্মক সব অপরাধে। সংখ্যার দিক থেকেও দিন দিন কিশোর অপরাধী ও গ্যাংয়ের সংখ্যা পাল্লা দিয়েই বেড়ে চলেছে। অতিসম্প্রতি র‌্যাব সদস্যরা রাজধানীর মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গিসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু গ্যাং সদস্যকে আটক করে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহে ২/৪ দিন গ্যাং সদস্যদের আড্ডাবাজি বন্ধ থাকলেও আবার অভিন্ন স্টাইলেই তৎপর হয়ে উঠছে তারা। শুধুমাত্র সমবেত হওয়ার আড্ডাস্থলটা সামান্য বদল হচ্ছে। সারাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও এখন কিশোর গ্যাং সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা তাদের ব্যবহার করেন। আর সেই ক্ষমতায় গ্যাংগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক হিসেবে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীম ফেরদৌস বলেন, কিশোর অপরাধীরা এখন শুধু ইভটিজিং কিংবা ছিনতাই করছে না; হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক ব্যবসা এমনকি দেশ থেকে নারী পাচারের মতো কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ার উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। প্রায় একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন থানা পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাগণও। তারা বলেছেন, আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। খুনির বিচার খুনের আইনেই করতে হবে। কিশোর বা তরুণ বলে ছাড় পাওয়ার সুযোগ আইনে রাখার কারণেই এর পুরোপুরি সুযোগ নিচ্ছে কিশোর –তরুণ অপরাধীরা। সর্বশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজধানীতে প্রায় দেড়শ’ কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকার কথা তুলে ধরা হলেও মাঠ পর্যায়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় আশিটি গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখতে পাচ্ছেন। এরমধ্যে বিভিন্ন গ্যাংয়ের সাতশ’ থেকে আটশ’ সদস্যই মারাত্মক সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

ধানমন্ডিতে বেশ তৎপর থাকা তিনটি গ্রুপ হচ্ছে-একে ৪৭, নাইন এম এম, ফাইভ স্টার গ্রুপ। রায়েরবাজার এলাকায় সক্রিয় স্টার বন্ড গ্রুপ ও মোল্লা রাব্বি গ্রুপ, মোহাম্মদপুরে গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল- চিনে ল এবং কোপাইয়া দে গ্রুপ। ওয়ারী ও লালবাগ এলাকায় বাংলা ও লাভলেট জুম্মন গ্যাং; মুগদায় চান-জাদু, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি গ্যাং; চকবাজারে টিকটক গ্যাং উল্লেখযোগ্য। তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্রুপ; মিরপুরে বিহারি রাসেল গ্যাং, সুমন গ্যাং, বিচ্চু বাহিনী, পিচ্চি বাবু, সাইফুলের গ্যাং, সাব্বির গ্যাং, বাবু-রাজন গ্যাং, রিপন গ্যাং, মোবারক গ্যাং এবং নয়ন গ্যাং। তবে বৃহত্তর উত্তরা জুড়ে রয়েছে কিশোর গ্যাংগুলোর ভয়ঙ্কর দৌরাত্ম্য। তুরাগে তালাচাবি গ্যাং; উত্তরায় পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার, নাইন এমএম বয়েজ, এনএনএস, এফ,এইচ বি, জি ইউ ক্যাকরা, ডি,এইচ,বি, ব্ল্যাক রোজ, রনো, কে নাইন, ফিফটিন গ্যাং, সুজন ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান এবং থ্রি গোল গ্যাং। দক্ষিণখানে শাহীন-রিপন গ্যাং; উত্তরখান বড়বাগের নাজিমউদ্দিন গ্যাং, শান্ত গ্যাং, মেহেদী গ্যাং, সোলেমান গ্যাং, রাসেল এবং উজ্জ্বল গ্যাং। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ব্রাম্মনবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, খুলনা মহানগর, রাজশাহীর পল্লীতে, নারায়নগঞ্জ, ময়মনসিংহ নগরী ও ত্রিশালে, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও চাঁদপুরে কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এলাকা পর্যায়ে রাজধানী ঘেষা জনপদ টঙ্গীতে অন্তত ৩৫টি গ্যাং, সাভারে ২৯টি, কেরানীগঞ্জে ২৬টি কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার খবর পাওয়া গেছে।

এভাবে সারাদেশে গ্যাং দৌরাত্মে কিশোর অপরাধ বেড়েই যাচ্ছে। গডফাদাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করছে। অস্ত্রধারী কিশোরদের ‘গ্যাং কালচার’ দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। পাড়া-মহল্লায় নানা নামে কিশোররা সংঘবদ্ধ গ্রুপ করে অপরাধ করছে। বড় ধরনের অপরাধ করলেই কেবল সেটি আলোচনায় আসে। কিন্তু গ্যাং সদস্যদের নিত্য অপকর্ম যেমন ইভটিজিং, পথচারী নারী পুরুষদের নীপিড়ন চালানো, চাঁদাবাজি, পছন্দের জিনিসপত্র, ঘড়ি, মানিব্যাগ ইত্যাদি জোর করে কেড়ে রাখার মতো অসংখ্য ঘটনা নিয়ে ভুক্তভোগিরা মুখও খোলেন না। ফেসবুকেই গ্রুপ গঠন: গ্যাং গঠনের ক্ষেত্রেও তথ্য প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকটি চরম অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। কিশোর বয়সের শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্মার্ট ফোন, আছে নেট সংযোগের অবাধ ব্যবস্থা। ফেসবুকে পেইজ বা গ্রুপ খোলার মধ্য দিয়েই সদস্য সংগ্রহ করে গ্রুপ গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালী কেউ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা মাদক বাণিজ্যে জড়িত একজন এগিয়ে সে গ্রুপের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব গ্রহণ করে। গ্যাং গড়ে ওঠার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। ‘টিকটক রিদয়ের’ পর টঙ্গির আরেকটি ‘আলোচিত’ কিশোর গ্যাং-এর নাম ‘ডেয়ারিং কোম্পানি বা ডি কোম্পানি।’ সদস্যরা কিশোর হলেও এই গ্যাং-এর প্রধান লন্ডন ফেরত তরুণ ‘লন্ডন বাপ্পি’ নামে পরিচিত। ফেসবুক গ্রুপ খুলে কিশোর গ্যাংটি গড়ে তুললেও সে এই কিশোরদের দিয়ে জমি দখল থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতো। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোচনায় আসা উত্তরার কিশোর গ্যাংটিও সিনিয়িরদের গড়া। তারাও ফেসবুকে সংগঠিত।

এর আগে সাভারে যে কিশোর গ্যাং-এর হাতে নিহত হয় স্কুল ছাত্রী নীলা রায়, সেই গ্যাংটিরও নেপথ্যে ছিল স্থানীয় যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান। সেও তার অপরাধ অপকর্মের জন্য এই গ্যাংটি তৈরি করে এবং তাদেরও একটি ফেসবুক গ্রুপ ছিল। আর বরগুনার বহুল আলোচিত ‘নয়নবন্ড’ গ্রুপটির মূলেও ছিলো রাজনৈতিক শক্তি, মাদকের বাণিজ্য। এটিও গড়ে ওঠেছিল একটি ফেসবুক গ্রুপকে কেন্দ্র করে। কিশোর গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িতরা পর্যায়ক্রমে আলাদা আলাদা গ্রুপ তৈরি করে। তাদের ড্রেস কোড থাকে, আলাদা হেয়ার স্টাইল থাকে, তাদের চালচলনও ভিন্ন। এসবের জন্য বাড়তি খরচের প্রয়োজন হয়। শুরুতেই নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে তারা সেই অর্থ সংস্থানের চেষ্টা করে। এলাকার কোনো ‘বড় ভাই’র সহযোগী শক্তি হিসেবেও তারা কাজ করে।

কিশোর গ্যায়ের বেপরোয়া দৌরাত্মে গোটা ময়মনসিংহ যেন জিম্মি হয়ে আছে। ময়মনসিংহ মহানগর, ত্রিশাল ও গফরগাঁও সহ জেলার প্রতিটি থানা, বাস টার্মিনাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গেটের আশপাশে, বাণিজ্য বিতান, শপিং মলসহ জনাকীর্ণ স্থানসমূহে তাদের সচরাচর বিচরণ থাকে। মুখে খিস্তি খেউর, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, মারমুখী আচরণ নিয়ে তারা দাপিয়ে বেড়ায় যত্রতত্র। ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি ছাড়াও ইদানিং কিশোর গ্যাংগুলো পেশাদার অপরাধীদের মতো রীতিমত ভাড়ায় খেটে জায়গা জমি জবর দখল, বাড়িঘর উচ্ছেদ এমনকি খুন খারাবির ঘটনা ঘটিয়ে থাকে বলেও এন্তার অভিযোগ রয়েছে। জেলার সবচেয়ে আতংকের জনপদ হয়ে উঠেছে ত্রিশাল এলাকায় । সেখানে মিল কারখানার আধিক্য থাকায় চাঁদাবাজি, মাসোহারা তোলার জন্য গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে কিশোর গ্যাংগুলো রীতিমত দৌড়ঝাপে সদা ব্যস্ত থাকে। এসব গ্রুপেন অনুমতি চাড়া কোনো কারখানা থেকে মালামাল বের করার যেমন উপায় নেই, তেমনি কারখানার ভেতরেও কোনো মলামাল ঢুকানোর উপায় থাকে না। গ্যাগুলোর বেধে দেয়া কমিশন দিয়ে তবেই মালামালের আনলোড করার সুযোগ মেলে। তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |